dailyinqilab.com · Mar 1, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260301T184500Z
ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। ৯২টি বিদ্যমান আইনের সংশোধনী, ৩৮টি সম্পূর্ণ নতুন আইন এবং ৩টি পুরনো আইন রহিতকরণ সংক্রান্ত। এত অল্প সময়ে অতীতের কোনো অস্থায়ী সরকার এত সংখ্যক অধ্যাদেশ জারি করেনি। আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং শাখার একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বিগত সরকার এসব অধ্যাদেশ জারি করে। এমন অধ্যাদেশও রয়েছে যেগুলোর কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। প্রচ- সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করেছে। পরক্ষণেই সেটি সংশোধনও করেছে। প্রয়োজনীয়তা ও পরিণতি না ভেবে এমনটি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতামতও নেয়া হয়নি। তাদের মতে, এমন কিছু অধ্যাদেশ রয়েছে যেগুলোর সারবত্তা সম্পর্কে ইউনূস সরকারের আইন উপদেষ্টা চোখ বুলিয়েও দেখেননি। অধ্যাদেশগুলো ত্রয়োদশ সংসদ ‘রেটিফাই’ বা অনুমোদন না করলে সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে পরর্বর্তী ৩০ দিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্তি ঘটবে। সে ক্ষেত্রে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ সংকটে পড়বে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি’র সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশই অনুমোদন দেবেÑ এমন গ্যারান্টি নেই। সরকার যেগুলোর প্রয়োজন বোধ করবে সেগুলোই শুধু অনুমোদন দেবে। বাকিগুলোর বিষয়ে বিরোধী দলের যতই ওজর-আপত্তি থাক না কেন, সেটি হবে নিষ্ফল। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, আগামী ১২ মার্চ সংসদের যে প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে সেটি হবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অধিবেশন হবে উত্তপ্ত। প্রাণবন্ত। জাতীয় সংসদকে বলা হয় গণতন্ত্র চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে বিতর্ক হবে। প্রতিবাদ হবে। সহমত-দ্বিমত হবে। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। দেড় যুগ পর মানুষ সেই সৌন্দর্য অবলোকন করবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের একটি বড় সংযুক্তি আছে। সেটি হচ্ছেÑ জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় উৎসরিত নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। আর আছে অপেক্ষাকৃত তিন গুণ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দলে থাকা জামায়াতে ইসলামী। শেষোক্ত দল দু’টি ইতিবাচক রাজনীতি করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এবারের সংসদে দু’টি বিযুক্তিও রয়েছে। সংসদে এবার নেই আওয়ামী লীগ। দলটির সহচর ‘জাতীয় পার্টি’ও। ধারণা করা হচ্ছে, জাতি এবার একটি কার্যকর এবং ‘অন্য রকম’ সংসদীয় রূপ প্রত্যক্ষ করবে। প্রথম অধিবেশনেই উত্তাপ ছড়াবে সংসদ। নিয়ম অনুযায়ী সংসদের অনুপস্থিতিতে জারিকৃত অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার জন্য প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উত্থাপন হতে হবে। আভাস পাওয়া যাচ্ছে, প্রথম অধিবেশনেই উত্থাপিত হবে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ‘গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি, সংস্কার ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, সংবিধানে ‘বিচার ও আইন সংস্কার’ সংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন অধ্যাদেশ, সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ‘গ্রেফতারের পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারকে তথ্য প্রদান’ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ এবং পুনর্বাসন অধ্যাদেশ’, ‘প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার’এর মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, গ্রামীণ ব্যাংকের সরকারি মালিকানা ২৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে এ অধ্যাদেশের আওতায়। শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা ৭৫% থেকে বাগিয়ে ৯০ শতাংশ করা হয়। ডাক পরিষেবা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। নির্বাচনী বিধি সংশোধন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, যাতে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা প্রদানের ক্ষমতা আরপিওতে যুক্ত করা হয়েছে। আরো কিছু অধ্যাদেশ সংসদে উত্তাপ ছড়াবেÑ মর্মে ধারণা করছেন আইনজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। এ তালিকায় রয়েছে, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ-২০২৪’। অধ্যাদেশটির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা এবং এর কার্যাবলিকে আইনি সুরক্ষা দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ। জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ। স্থানীয় সরকার কাঠামোর পরিবর্তনের লক্ষ্যে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) অধ্যাদেশ। সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ। সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা ও আপিলের বিধান সংশোধনে এটি জারি করা হয়। মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবস্থাপনার জন্য এ অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। ভোটার তালিকা (সংশোধন) অধ্যাদেশ। সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য অধ্যাদেশটির মাধ্যমে সংশোধনী আনা হয়। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ। ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) অধ্যাদেশ। জরিমানা ও রিমান্ড সংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তনের জন্য অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। বলা বাহুল্য, অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজনীয়তার অনুভব থেকে। এসব অধ্যাদেশের অনেকগুলোর সঙ্গেই সরকারি দল বিএনপি, বিরোধী দল-জামায়াত, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের পরিষ্কার বৈপরীত্ব রয়েছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের শতভাগ অধ্যাদেশ অনুমোদন দেবে কি নাÑ এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সকাল-বিকাল এত এত অধ্যাদেশ জারি হয়েছে যে, এগুলোর আইনি ফলাফল, ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া ভেবেও দেখেনি সরকার। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক তো রীতিমতো সংশয় প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, অন্তর্বর্তী সরকার জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোর ‘মৃত্যু’ আসন্ন কি না! একটি কলামে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এখন তো ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নেই। তাহলে জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোর কী হবে? তার ধারণা, বেশির ভাগ নাগরিকই মনে করছেন, নতুন সংসদ বেশির ভাগ অধ্যাদেশকেই আইন হিসেবে পাস করিয়ে অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা চলমান রাখবে। কিন্তু এখানে একটা বড় ‘প্যারা’ আছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদটি বড়ই বেরসিক। প্রথমত, রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন মনে করলেও ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির জন্য তিন-তিনটি সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। সেগুলো হলোÑ (ক) সংসদ যে আইন সংবিধান অনুযায়ী প্রণয়ন করতে পারে না, সেই রকম আইন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ রূপে জারি করতে পারবেন না; (খ) অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো বিধানকে সংশোধন অথবা বিলুপ্ত করা যাবে না। যেমন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারবে নাÑ এমনটি করা যাবে না; (গ) পূর্বের অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বহাল বা চলমান রাখার জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন না। তর্কের খাতিরে যেকোনো ব্যক্তি দাবি করতে পারেন, প্রণীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনোটিই এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেনি অথবা দিলদরিয়া মানুষ হলে হয়তো মেনে নেবেন যে দু-চারটা অধ্যাদেশ এই সীমা লঙ্ঘন করেছে। সে কারণে দু-চারটা অধ্যাদেশ বাতিল হলেও হতে পারে। অর্থাৎ বেশির ভাগ অধ্যাদেশই বহাল তবিয়তে বিদ্যমান থাকবে। ড. শাহদীন মালিকের মতে, সংবিধানের উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুযায়ী সংসদের জন্য তিনটি পথ এখন খোলা। উপস্থাপনের দিনই সংসদ সব অধ্যাদেশ একযোগেই বাতিল করতে পারে। প্রথম দিনই বাতিল না করলে সংসদের দ্বিতীয় করণীয় হলো ক্রমান্বয়ে, যেমন প্রথম দিন ৫টি; তার দু-তিন দিন পর আরো ১০টি এবং পরবর্তী সপ্তাহে আরো ২০টি। এভাবেও অধ্যাদেশগুলো বাতিল করতে পারে। আর যদি অধ্যাদেশগুলো প্রথম দিনে অথবা ক্রমান্বয়ে বাতিল না করা হয় বা কয়েকটি বাতিল হয় আর কয়েকটি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তই না নেয়া হয়, তাহলে উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুযায়ী প্রথম সংসদ অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় যেগুলো বাতিল হলো, আর যেগুলোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি, তার সব ক’টি অধ্যাদেশেরই ‘কার্যকারিতা লোপ পাইবে’। সোজা কথায়, সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় সব অধ্যাদেশই নির্বিশেষে ‘মারা’ যাবে! প্রশ্ন হচ্ছে-করণীয় কী? এ প্রশ্নে ড. শাহদীন মালিকের অভিমত হচ্ছে, এই প্রক্রিয়ায় থাকবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্বারা এই আইনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি; সারসংক্ষেপটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন এবং মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদন। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আইনটির খসড়া প্রস্তুত করবে এবং খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার মন্ত্রিপরিষদের সভায় পেশ করা হবে। ধারণা করা যায় যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়তো ভেবেছিল, অধ্যাদেশ জারি করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তারা সম্ভবত খেয়াল করেনি, এই অধ্যাদেশগুলো স্বল্পমেয়াদি। পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সব অধ্যাদেশই বিলোপ হয়ে যাবে।