dailyjanakantha.com · Feb 20, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260220T193000Z
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দৃশ্যমান এক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল-ভারতকেন্দ্রিক নির্ভরতার বাইরে গিয়ে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য গড়া- নতুন সরকার সেটিকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে আনছে। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, সরকার মূলত জিয়াউর রহমানের অনুসৃত নীতির ধারায় ফিরতে চায়। এই অবস্থানকে অনেকে বলছেন, ‘নতুন বাংলাদেশের পুরোনো কূটনৈতিক প্রত্যাবর্তন’। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে। ভিসা কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ, উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগে শীতলতা সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এক ধরনের অচলাবস্থায় পৌঁছায়। যদিও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলের ইঙ্গিত মিলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান এবং টেলিফোনে কথা বলেন। শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ দূত পাঠানো হয় এবং সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের ঢাকা সফরও কূটনৈতিক বরফ গলানোর বার্তা দেয়। এদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা সব মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার বদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট। জিয়াউর রহমানের নীতি- বহুমুখী, বাস্তববাদী ও স্বার্থকেন্দ্রিক ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান সেই নীতিতে পরিবর্তন আনেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনীতির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যম। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পৃক্ততা, ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস, শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান, ১৯৭৬-৭৮ সময়ে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য মার্কিন সহায়তা পায়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক তৎপরতায় অর্থনৈতিক সহায়তা ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ঘটে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগও সে সময় নেওয়া হয়। সার্ক ধারণা আঞ্চলিক ভারসাম্যের কৌশল ॥ জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা সামনে আনেন, যা পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিয়নাল কো-অপারেশন (সার্ক) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবের বিপরীতে একটি বহুপাক্ষিক কাঠামো দাঁড় করানোর কৌশল। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে সার্ক পুনরুজ্জীবনের কথা বলেছেন, যা জিয়ার কূটনৈতিক উত্তরাধিকারকে পুনরায় সক্রিয় করার ইঙ্গিত দেয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নাকি নীতির পরিবর্তন! ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির অঙ্গীকার করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বলেন, ‘বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা করেই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা হবে।’ সাবেক কূটনীতিকদের মতে, এই নীতি কার্যকর করতে হলে কেবল অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্য নয়, কৌশলগত স্বার্থভিত্তিক পুনর্গঠন প্রয়োজন। অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাÑ সব ক্ষেত্রেই পেশাদার কূটনীতি অপরিহার্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘প্রথম বাংলাদেশ’ মানে বাংলাদেশের স্বার্থ যেন খ-িত না হয়। তবে ভারসাম্য রক্ষার ব্যাখ্যা অনেক সময় ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। আসল বিষয় হলো- কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যেন তৃতীয় দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়।’ তার মতে, বিশ্ব এখন বহুমাত্রিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশকে কাঁচামাল আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির বাস্তবতায় বহুপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। একমুখী নির্ভরতা উন্নয়নকে ব্যাহত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, কূটনীতিতে পেশাদারিত্বের ঘাটতি থাকলে বহুমাত্রিক নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। “এখানে জ্ঞান, দক্ষতা ও কৌশলগত পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সংঘাত নাকি পুনর্গঠন! গত দেড় বছরে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন সবার নজরে এসেছে। ভিসা বন্ধ, সীমান্ত ইস্যু ও রাজনৈতিক বক্তব্য- সব মিলিয়ে সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয়। তবে নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন এবং ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর ইঙ্গিত সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভৌগোলিক বাস্তবতা, বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি ও নিরাপত্তাÑ সবকিছুতেই পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। তবে সম্পর্কটি সমতা, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হবে কি নাÑ সেটিই এখন দেখার বিষয়। চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহম্মদ জনকণ্ঠকে বলেন, জিয়াউর রহমানের ফরেন পলিসি বলতে যা বুঝানো হচ্ছে তা বর্তমানে অনেকে বলতেই পারবেনা। জিয়াউর রহমানের আমলে সব উদ্যোগ তো আর মনে নেই তবে র্সার্ক তিনি গঠন করেন। সেটি ফরেন পলিসিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তা ছাড়া তিনি মুসলিমদের নিয়েও অনেক পরিকল্পনা নিয়েছিলেন কিন্তু সময়ের কারণে সবগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্তিতিতে যে চ্যালেঞ্জগুলো সামনে রয়েছে- চীন-যুক্তরাষ্ট্র ভারসাম্য রক্ষা করে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা, স্থবিরতা কাটিয়ে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা, মুসলিম বিশ্বে সক্রিয়তা বজায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার, পেশাদার কূটনীতিতে দক্ষ কূটনীতি ও নীতিনির্ধারণে সমন্বিত পরিকল্পনা করা। পুরোনো পথে নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে পরিবর্তনের আভাস মিলছে, তা সম্পূর্ণ নতুন নয়; বরং অতীতের এক কৌশলগত দর্শনের পুনরাবিষ্কার। জিয়াউর রহমানের বাস্তববাদী, বহুমাত্রিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক নীতিকে নতুন প্রেক্ষাপটে প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। তবে বিশ্ব রাজনীতি এখন শীতল যুদ্ধের সময়ের মতো দ্বিমেরু নয়। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সব মিলিয়ে বাস্তবতা অনেক জটিল। ফলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে, নাকি পেশাদার কূটনীতির মাধ্যমে কার্যকর নীতিতে রূপ নেবে সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি সত্যিই পুরোনো পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরছে, নাকি পুরোনো কাঠামোকে নতুন বাস্তবতায় রূপান্তর করছে- তার উত্তর যথাসময়ে মিলবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা!