dailyjanakantha.com · Feb 14, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260214T201500Z
সীমান্তে জামায়াতের জোয়ারের কারণ আধিপত্যবাদ বিরোধিতা প্রকাশিত: ০০:০২, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সীমান্তে জামায়াতের জোয়ারের কারণ আধিপত্যবাদ বিরোধিতা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নতুন মোড়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসন ও ভোট পেয়ে সংসদে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন প্রতিনিধি (জোটগত ৭৭ আসন)। দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক অনন্য মাইলফলক। অতীতে তাদের সর্বোচ্চ আসন ছিল ১৮টি। এবার তা প্রায় চারগুণ ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই সাফল্য কেবল সংখ্যার নয়; এটি ভূ-রাজনীতি, সীমান্ত রাজনীতি, সংগঠনশক্তি এবং জনমনের আবেগÑ সব কিছুর এক জটিল সমন্বয়ের ফল। সীমান্তে দাঁড়িপাল্লার জোয়ার ॥ নির্বাচনের ফলাফলের ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলÑ বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াত দৃষ্টি কেড়েছে। খুলনা বিভাগের ৩৬টির মধ্যে ২৫টি, রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসনে জয় দলটির আঞ্চলিক শক্তিমত্তার প্রমাণ দেয়। সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে প্রায় সর্বাত্মক বিজয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। এসব জেলার সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সরাসরি সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিনের নানা ইস্যুÑ বিএসএফের গুলিতে হতাহতের অভিযোগ, সীমান্ত বাণিজ্য, চোরাচালান, ফেন্সিং এবং নদী-পানি বণ্টনÑ স্থানীয় জনগণের মনে জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে তীব্র করেছে। ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধিতা’-কে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করে জামায়াত সীমান্ত অঞ্চলে একটি আবেগভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ধস থেকে পুনরুত্থান ॥ ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত কার্যত ভরাডুবির মুখে পড়ে। যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রেক্ষাপট, নেতৃত্বের শূন্যতা ও রাজনৈতিক চাপে দলটির অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সংগঠন ভেঙে পড়েনি। বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে ভরাডুবির পর সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কর্মী-সমর্থকরা দলত্যাগ করেন, নেতৃত্বে বিভক্তি দেখা দেয়। কিন্তু জামায়াত তাদের কাঠামো অটুট রাখে। ওয়ার্ড থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ সাংগঠনিক ব্যবস্থা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শভিত্তিক কর্মী গড়ে তোলার কৌশল তাদের টিকিয়ে রাখে। এবার নির্বাচিত ৬৮ জনের মধ্যে ৬৫ জনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। এটি দলটির প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়Ñ একদিকে নতুন মুখ, অন্যদিকে পুরনো সাংগঠনিক ভিত্তি। আঞ্চলিক রাজনীতির পুনর্বিন্যাস ॥ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামানের মতে, খুলনা ও রংপুর বিভাগের বেশির ভাগ আসনে জামায়াতের বিজয় আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতার ফল। সীমান্ত এলাকায় ভারতবিরোধী মনোভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। কিছু আসনে জামায়াত অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। এটিও ভবিষ্যতের জন্য তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। কারণ, ভোটের ব্যবধান কমে আসা মানে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বিস্তৃত হওয়া। বিকল্প শক্তির উত্থান ॥ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন ও আস্থাহীনতা প্রবল। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ, বিরোধী জোটের দুর্বলতা এবং নতুন রাজনৈতিক ভাষ্যের অভাবÑ এই শূন্যতায় জামায়াত নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তাদের প্রচারে ছিল তিনটি মূল উপাদান ॥ এক. আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান। দুই. ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির পুনরুজ্জীবন। তিন. সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মী নেটওয়ার্ক। এই ত্রিমুখী কৌশল সীমান্ত ও গ্রামীণ ভোটব্যাংকে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। জোট রাজনীতি ও কৌশলগত সাফল্য ॥ রংপুর ও কুড়িগ্রামের সব আসন জোটগতভাবে জয়ী হওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে দুটি আসন শরিক এনসিপি পেয়েছে। অর্থাৎ জামায়াত শুধু একক শক্তি নয়, বরং জোট কৌশলেও সফল হয়েছে। এটি ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে। সংসদে প্রভাব কেমন হবে ॥ ৬৮ বা জোটগতভাবে ৭৭ আসনÑ এটি সংসদীয় রাজনীতিতে একটি বড় উপস্থিতি। এই উপস্থিতি পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর অবস্থান, সীমান্ত ও পানি বণ্টন ইস্যুতে সংসদে জোরালো বিতর্ক, ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক আইন প্রস্তাব এবং জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে। জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণÑ এসবই হবে জামায়াত ও তার শরিকদের জন্য বড় পরীক্ষা। নির্বাচনে বাস্তবতা বলছে জামায়াতের এই উত্থান কেবল ভারতবিরোধী আবেগের ফল নয়, দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক কৌশলের সাফল্যও বটে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুইয়ের সমন্বয়ই কাজ করেছে। সীমান্ত রাজনীতির আবেগ, জাতীয়তাবাদ ও ইসলামিক ভাষ্য এবং সংগঠনের দৃঢ়তাÑ সব মিলিয়ে তারা এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় সূচনা করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই শুধু আসনের হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে শক্তির ভারসাম্য বদলের ইঙ্গিতও বহন করছে। সামনে সংসদে তাদের ভূমিকা ও আচরণই নির্ধারণ করবেÑ এই উত্থান সাময়িক ঢেউ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা। প্যানেল হু