dailyinqilab.com · Feb 16, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260216T194500Z
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়টি যেনো অনেকটা সেই, ‘তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেনের’ মতো ঘটনা। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে মাত্র ২ মাসের মধ্যে তারেক রহমান নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব দিলেন এবং মিত্রদের ছাড়াই এককভাবে নিজ দলের জন্য ২০৯টি আসন, অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশ আসন জয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তারেক রহমান আরেক দিক দিয়েও ইতিহাস গড়লেন। বলা যায়, হ্যাট্রিক। তার অসম্ভব জনপ্রিয় পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনীতির মাঠে এসে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। অনুরূপভাবে তার মাতা বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে জড়িত হয়েই প্রথম নির্বাচনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী হন। একইভাবে তারেক রহমানও বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত হয়ে তার জীবনে প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একেবারে ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি অর্জন করলেন এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন। এসব ঘটনার পটভূমিতে স্বাভাবিকভাবে শুধুমাত্র পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশই নয়, বরং সারা বিশ্ব বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের দিকে তাকিয়েছিল। সেই নির্বাচনে তিনি যখন দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করলেন তখন সমগ্র বিশ্ব তার দিকে বিস্ফারিত নেত্রে তাকালো। নির্বাচনের এক দিন পর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ডেজিগনেট বা The Prime Minister in Waiting (তখনো যেহেতু তিনি শপথ নেননি) যখন সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন তখন অত্যন্ত বাস্তব কারণেই সেই সম্মেলনটি জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। ৪০ মিনিটের এই প্রেস ব্রিফিংয়ে পৃথিবীর সব নামজাদা প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং সমস্ত দেশি প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং নিউজ পোর্টালের প্রতিনিধিরা যোগদান করেন। নির্বাচনী বিজয়ের পর প্রথম প্রেস কনফারেন্স হলেও এবং তখনো সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ না করলেও তাকে সব সাংবাদিকই ২ দিন পরের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আজ মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দিবসের পূর্বাহ্নে নব নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ এবং অপরাহ্নে বা সন্ধ্যায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করবেন। যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী ডেজিগনেটকে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছিলো, তার মধ্যে এমন সব প্রশ্ন ছিলো, যেগুলো একজন প্রধানমন্ত্রীই যোগ্য উত্তর দিতে পারেন। কিন্তু শপথ গ্রহণ না করা সত্ত্বেও তারেক রহমান অত্যন্ত স্মার্টলি সেসব প্রশ্নের যথাযোগ্য উত্তর দেন। প্রথমে বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ইংরেজিতে সূচনা বক্তব্য দেন এবং পরবর্তীতে বাংলা বক্তব্য অত্যন্ত সাবলীলভাবে পাঠ করেন। এর পর প্রতিটি প্রশ্নের এমন সুস্পষ্ট জবাব দেন যে, সেখানে পাল্টা প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ ছিলো না। প্রেস কনফারেন্স যখন সাঙ্গ হলো তখন বোঝা গেলো, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক নির্বিশেষে সকল সাংবাদিক ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর ওপর দারুণভাবে ইম্প্রেসড হয়েছেন। অধিকাংশ প্রশ্নই ছিলো বেশ ট্রিকি (Tricky)। বলা বাহুল্য, জুলাই বিপ্লব এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক ল্যান্ডস্কেপ দারুণভাবে পাল্টে দিয়েছে। বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা ১৫ বছর ধরে ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। পাকিস্তান এই উপমহাদেশের একটি দেশ এবং বিপুলভাবে মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার আমলে মনে হয়েছিলো যে, পাকিস্তান একটি নিষিদ্ধ দেশ। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনে পাক-ভারত সম্পর্কে শুধুমাত্র ভারসাম্যই প্রতিষ্ঠা করা হয়নি, বরং ভারতের বশ্যতামূলক শৃঙ্খল থেকে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে বের করে এনেছেন। এর আগে বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন এবং এই অঞ্চলের জিও স্ট্র্যাটেজিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ বিশে^র প্রধান ৩টি বড় দেশের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ৩টি দেশ হলো আমেরিকা, চীন এবং ভারত। ভারত তো বাংলাদেশকে শেখ হাসিনার আমলে কব্জাই করে রেখেছিলো। জুলাই বিপ্লবের পর সেই কব্জা ছিন্ন হলে বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকা এবং চীনের বাড়তি আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এই পটভূমিতে তারেক রহমানের প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের কাছে পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। আর তারেক রহমানও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ না করেও এবং মন্ত্রিসভা গঠন না করেও অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে এই জিও পলিটিক্যাল প্রশ্নগুলির উত্তর দেন। ॥দুই॥এক ভারতীয় সাংবাদিক তারেক রহমানকে প্রশ্ন করেন, পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আপনি কীভাবে দেখেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় আপনি পুনর্বিবেচনা করবেন কি? বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় বলতে তিনি শেখ হাসিনার মৃত্যুদ-কেই বুঝিয়েছিলেন। জবাবে তারেক রহমান বলেন, পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে আমরা নিজেদের অবস্থান আগেই স্পষ্ট করেছি এবং তা হলো বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ সবার আগে। তিনি বলেন, দেশের জনগণের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করবো আমরা। পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো একক দেশের প্রতি আনুগত্য নয়, পারস্পারিক সম্মান, সমতা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ঠিক হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় প্রসঙ্গে আমীর খসরু বলেন, এটা আদালতের বিষয়। ড. ইউনূস তার ১৮ মাসের শাসনামলের শুরু থেকেই সার্কের ওপর সমধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। কিন্তু বোধগম্য কারণেই তার সেই গুরুত্ব প্রদান এবং প্রচেষ্টা ফলবতী হয়নি। পাকিস্তানের ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম ‘জিও নিউজের’ সাংবাদিক জানতে চান যে, সার্কের পুনরুজ্জীবন সম্পর্কে তার ধারণা কী? জবাবে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশই সার্কের উদ্যোক্তা ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা চাইব সার্কের পুনরুজ্জীবন। বিএনপি সরকার গঠনের পর এই বিষয়ে উদ্যোগ নেবে। এই বিষয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কথা বলবে সরকার। তিনি আরো বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর অবশ্যই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবে।বিএনপি চেয়ারম্যান এবং প্রাইম মিনিস্টার ডেজিগনেট তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ যাতে আর তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত না হয় সেজন্য সকলে মিলে কাজ করব ইনশাল্লাহ। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন তারেক রহমান। বলেন, চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার। আশা করি, ভবিষ্যতে উভয় দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। ॥তিন॥তারেক রহমান বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছেন যে, যে ধ্বংস স্তূপের মধ্য থেকে জুলাই বিপ্লব দেশকে টেনে উদ্ধার করেছে সেখানে সেই দেশকে আবার সুশাসন এবং উন্নয়নের মহাসড়কে তুলতে গেলে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের। নির্বাচন হবে, বিভিন্ন দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। একদল জিতবে, আরেক দল হারবে। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য। নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। এজন্য তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, জাতীয় সংসদে ২টি বিরোধী দলের ২ জন নেতার সাথে তাদের বাসভবনে গিয়ে তিনি সাক্ষাৎ করবেন। একজন হলেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আমীর ড. শফিকুর রহমান এবং অপর জন হলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার এই সৌজন্য সাক্ষাৎ বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনে সহায়ক হবে বলে শিক্ষিত-সচেতন মানুষের বিশ্বাস। এই নির্বাচনের পর কয়েকটি শুভ লক্ষণ দেখা গিয়েছে। জামায়াতের একাধিক নেতা পরাজিত হবার পর তাৎক্ষণিকভাবে বিজয়ী প্রার্থীকে মেনে নিয়েছেন এবং পুষ্পস্তবক নিয়ে বিজয়ীর সাথে দেখা করেছেন। অনুরূপভাবে এক বা একাধিক বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী পরাস্ত জামায়াত প্রার্থীর বাসভবনে গিয়ে দেখা করেছেন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা তথা নতুন নির্বাচিত সরকার সম্পর্কে এই মুহূর্তে আর বেশি কথা বলা যাচ্ছে না। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান টেলিভিশন এবং রেডিওতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। সেই ভাষণটিও হবে মূল্যবান। কারণ, সেই ভাষণে স্বল্প মেয়াদ এবং মধ্য মেয়াদে তার সরকার কী করতে চায় সেটি দেশবাসীকে জানাবেন। তখন সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। শেষ করার আগে বিদায়ী সরকার অর্থাৎ ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকার সম্পর্কে দুটি কথা না বললেই নয়। সাধারণত দেখা যায়, কোনো নেতা যখন ক্ষমতায় যান তখন তারা কোনো কথা রাখেন না। ড. ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা পরিষদ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। তারা কথা রেখেছেন। প্রথমে তো তিনি সরকারের দায়িত্বই গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তারপর যখন তরুণ ছাত্র নেতাদের পীড়াপীড়িতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখনই বলে দিয়েছিলেন যে, ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যেই তিনি ইলেকশন দেবেন এবং তার পরিষদ তাদের আগের কাজে ফিরে যাবে। জুন মাসের ৪ মাস আগেই তিনি নির্বাচন দিয়েছেন এবং সম্ভবত আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর তারেক রহমানের হাতে দায়িত্বভার অর্পণ করে তিনি একজন সাধারণ সিভিলিয়ান হিসাবে নিজের আগের কাজে ফিরে যাবেন। একই কাজ করবেন তার উপদেষ্টা পরিষদের অন্য সদস্যরাও। এটি ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। ড. ইউনূস বলেছিলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে ইলেকশন হবে। উৎসবমুখর পরিবেশেই ইলেকশন হয়েছে। তিনি আরো বলেছিলেন, এই ইলেকশনটি দুনিয়ার সামনে হবে একটি রোল মডেল। বাংলাদেশের সকলেই বলেছেন, ইলেকশনটি খুব ভালো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, ইলেকশন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। কথায় বলে, সব ভালো, যার শেষ ভালো। All is well whose end is well. ১৭ বছর পর একটি নির্বাচিত সরকার যাত্রা শুরু করলো। আশা করি , তার যাত্রা কুসুমাস্তীর্ণ হবে। Email:[email protected]