dailyinqilab.com · Feb 15, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260215T194500Z
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধ, আইনশৃংখলা সুরক্ষা ও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলেছেন, নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতি বরদাশত করা হবে না। তিনি এই মর্মে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ভুল বুঝাবুঝি বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, শান্তিশৃংখলা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই নতুন সরকারের অঙ্গীকার। তারেক রহমানকে ধন্যবাদ যে, তিনি নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত যৌক্তিক ও যথাযথ আহবান ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, ইতিহাসের সর্বসেরা জাতীয় নির্বাচন, যা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হিসাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে, সেই নির্বাচন পরবর্তীতে সংঘাত-সহিংসতা, আক্রমণ, ভাংচুর ইত্যাদি ঘটতে দেখা যাচ্ছে। যে নির্বাচনের দিনে একটিও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, সেই নির্বাচনের পরবর্তীতে কয়েকজন লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৮ জেলায় ১০টির বেশি সহিংসতায় দু’জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে। আরো সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত হওয়া ছাড়াও অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছে। সহিংসতার ঘটনা একতরফাভাবেই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। অক্রমণকারী বিজয়ী দলের নেতাকর্মীরা, আক্রান্ত বিজিত দলের নেতাকর্মীরা। জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। লক্ষ করা যাচ্ছে, বিজয়ী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে ধরনের উদারতা ও সহনশীলতা প্রত্যাশিত, সেটা দেখাতে তারা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহুবার বলেছেন, বিএনপি প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তারা বরাবরই নেতাকর্মীদের ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়ার তাকিদ দিয়েছেন। এরপরও নেতাকর্মীদের একাংশ ধৈর্য হারিয়ে সহিংস আচরণ করবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এতে দলের বদনাম হচ্ছে। জাতির মধ্যে বিভক্তিরেখা আরো প্রসারিত হচ্ছে। তারেক রহমান গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে আগের মতই জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বলেছেন, ঐক্যে শক্তি, বিভাজন দুর্বলতা। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বের নীতি ও অভিপ্রায়ের বিপরীতে যা ঘটছে, তা কেন ঘটছে, দলের নীতি নির্ধারকদের তা দ্রুত বিবেচনায় নিতে হবে, প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশ ও জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য আত্মশ্লাঘার বিষয় যে, নানা রকম সীমাবদ্ধতা ও হুমকি থাকা সত্ত্বেও আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন নির্বাচন সম্পন্ন করতে পেরেছি। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃংখলা বাহিনী এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টান্তস্থাপনকারী ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিপুল সংখক দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক সরেজমিনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা এক বাক্যে বলেছেন যে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ সচ্ছ ও পক্ষপাতহীনভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন বলেছে, নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে। কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল একই রকম বিবেচনা প্রকাশ করেছে। এইসঙ্গে দলটি জানিয়েছে, নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপর হামলা বা দমনের কোনো ঘটনা দেখা যায়নি। এখানে বিশেষভাবে স্মরণ করা দরকার, পতিত স্বৈরাচার ও তার প্রভু ভারতের তরফে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাশীন হওয়ার পর লাগাতার অভিযোগ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংখ্যালঘুদের ওপর জুলুম-নির্যাতন হচ্ছে এবং তাদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। এটা যে বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ, তা আন্তর্জাতিক মহল ও মিডিয়ার মোটেই অজানা নেই। দেশের গর্বিত নাগরিক হিসাবে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অবাধে, নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষকদলের অভিমতে তার সাক্ষ্য বিবৃত হয়েছে। এত প্রশংসাধন্য একটি নির্বাচন কিছু লোকের নির্বাচন পরবর্তী অবিমৃষ ও হঠকারী কাজ ও আচরণে মসীলিপ্ত হবে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। সরকার তার গোটা সময়কালে আইনশৃংখলা সুরক্ষার ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সফলতা দেখাতে পারেনি। বিগত মাসগুলোতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, সন্ত্রাস, চাঁদবাজি, দখলবাজি, হত্যা, অপহরণ, মববাজি সমানে চলেছে। সরকার এসবের প্রতিকারে উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি। কিন্তু দেশের মানুষ বিস্ময়ে দেখেছে, নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিনে দেশের আইন ও শৃংখলা অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত থেকেছে। মানুষ অবাধে-নির্ভয়ে চলাচল করেছে, ভোট দিয়েছে, ঘরে ফিরেছে। কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? সম্ভব হলো সরকার, প্রশাসন, আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণকারী সকল কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা, সততা ও দায়িত্বশীলতার কারণে। এই সাদিচ্ছা, সততা ও দায়িত্বশীলতায় এখন আবার টান পড়লো কেন, সেটাই প্রশ্ন। অন্তর্বর্তী সরকার যতক্ষণ ক্ষমতার আছে ততক্ষণ তাকে আইনশৃংখলা রক্ষা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের জন্য এখন সময়টা সন্ধিকাল। একটি সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবে, অন্য একটি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে। এমন সময়ে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে নতুন সরকারের ওপরে তার চাপ ও প্রভাব পড়বে। এ ধরনের সন্ধিসময়ে দেশবিরোধী, কুচক্রীমহল, সন্ত্রাসীরা তৎপর হয়ে ওঠে এবং ঘোলাপানিতে মাছ শিকারে লিপ্ত হয়। এদের ব্যাপারে বিদায়ী সরকারের সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। অন্যদিকে নতুন সরকার যে দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে, সেই বিএনপিকেও সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ প্রসঙ্গে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা বিভিন্ন মহলে প্রশংশিত হয়েছে। মানুষ তার বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ছাড়া দেশ গঠন কিংবা দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আবার দেশ গঠনে জাতীয় ঐক্যেরও বিকল্প নেই। পতিত স্বৈরাচার জাতিকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করে দুঃশাসন দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিয়েছিল। এখন জাতীয় ঐক্য দৃঢ়বদ্ধ ও সংহত করার সময় এসেছে। এখন থেকে বিভক্তির সব রেখা মুছে দিতে হবে। দেশের অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অর্থনীতি পুনর্গঠনে জোর হাত লাগাতে হবে। বিনিয়োগ আনতে হবে। এখনই সময় বিনিয়োগ আনার। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে সফল করে তুলতে কাক্সিক্ষত শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যকে দৃঢ় করতে হবে।