dailyinqilab.com · Feb 16, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260216T194500Z
আজ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ। এর আগে সকালে ত্রয়োদশ সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যারাও শপথ নেবেন। এর মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপির সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করবে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্যে দিয়ে নতুন যে সংসদ যাত্রা শুরু করবে, সেই সংসদে দুই তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য বিএনপির। পক্ষান্তরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংসদ সদস্য রয়েছেন ৭৭ জন, যারা বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। মন্ত্রিসভার আকার কেমন হবে, কারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাচ্ছেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অবধি ছিল না গতকাল পর্যন্ত। গতকালের পত্রপত্রিকার খবর মোতাবেক মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে। ৩৫ থেকে ৪০ সদস্যের মতো হতে পারে। শেষাবধি দুয়েকজন বাড়তেও পারে। কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন বা থাকতে পারেন, তা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নামের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কোনো তালিকাই নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষীয় সূত্রের দ্বারা সমর্থিত নয়। মন্ত্রিসভা কত ছোট বা বড় এবং তাতে কারা থাকছেন, তা একমাত্র তারেক রহমানই বলতে পারেন। এ ব্যাপারে তিনি কোনো কথা বা মন্তব্য করেননি। জানা গেছে, এ নিয়ে স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে তিনি আলাপ করেননি। যাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন, তাদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত এককভাবে তাকেই নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। কাজেই, যা কিছু করবেন, তারেক রহমানই করবেন। দলের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে চেয়ারম্যানের ‘সিক্রেট ফাইল’ বলে অভিহিত করেছেন। বলা বাহুল্য, এ ঘটনা তারেক রহমানের নেতৃত্বের দক্ষতা, প্রাজ্ঞতা এবং দলীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের তার প্রতি অবিচল আস্থার প্রমাণ বহন করে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, মন্ত্রিসভা ছোট আকারের এবং অধিকতর কার্যক্ষম, সৎ, স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হওয়া দরকার। নতুন সরকারের অনেক চ্যালেঞ্জ। তা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার মতো সামর্থ্য ও সক্ষমতা সরকারের থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও সুরক্ষা, বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও গতিশীল করা, ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজার উদ্ধার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ইত্যাদি নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য। শপথের পর থেকেই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে নতুন সরকারকে। নতুন সরকারের যেসব চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনেও এসব চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, চ্যালেঞ্জগুলো সরকার সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। আইন-শৃঙ্খলা, অর্থনীতি, ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানÑ কোনো ক্ষেত্রেই উল্লেখ করার মতো অগ্রগতি নেই। ক্ষেত্র বিশেষে বরং অবনতি ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই শেয়ার বাজারের চাঙ্গাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত আশার খবর। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে বর্ণিত সকল ক্ষেত্রে সুবাতাস প্রবাহিত হবে বলে পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন। একটি কার্যকর জাতীয় সংসদ আমাদের জন্য, দেশের প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নসহ উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য অপরিহার্যই শুধু নয়, জরুরিও বটে। দেড় যুগের বেশি দেশে কার্যকর কোনো সংসদ ছিল না। বিশেষ করে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল বিতর্কিত এবং সংসদ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার নির্বাচন। ওইসব নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদগুলোতে বিরোধী দল বলে কিছু ছিল না। বিরোধী দলের তথাকথিত সংসদ সদস্যরা কখনো সরকারের অংশ ছিলেন, কখনো ছিলেন সরকার দলের দাসানুদাস। তারা কখনই বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছিল ওই গোটা সময়কালে সরকারি দল। আর তথাকথিত বিরোধী দল ছিল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে ও সরকার হিসেবে ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে জাতীয় পার্টির নির্দিষ্ট ভূমিকা ও অবদান ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকার উৎখাত হয়েছে। দল হিসাবে আওয়ামী লীগ পতিত ও পরিত্যক্ত হয়েছে। জাতীয় পার্টিও কার্যত হারিয়ে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকে ২৯৯ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। দলটির কোনো প্রার্থীই জিততে পারেনি। ভোট পেয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। চরমোনাই পিরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়েও অনেক বেশি ভোট পেয়েছে। ২৫৭ আসনে প্রার্থী দিয়ে হাতপাখার প্রতীকে দলটি পেয়েছে ২ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট। নির্বাচনে বিএনপি ভোট এবং আসন উভয় ক্ষেত্রেই সর্বশীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আসন পেয়েছে ২৯৭ এর মধ্যে ২০৯টি। বিএনপি জোটের মোট আসন সংখ্যা ২১৫টি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ভোট পেয়েছে ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আসন পেয়েছে ৬৮টি। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্যে আছে এনসিপিসহ ১০টি দল। তাদের সাকল্য আসন সংখ্যা ৭৭। ভোট ও আসন সংখ্যার দিক দিয়ে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল। পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর একটি শক্তিশালী বিরোধী দল যাচ্ছে এবারের জাতীয় সংসদ। সরকারি দল ও বিরোধী দল কেবল সংসদেরই অংশ না, দেশ পরিচালনায়, আইন প্রণয়নসহ দেশের উন্নয়ন, বিকাশ ও প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য অংশীদারও বটে। কাজেই বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের কোনো বিকল্প হতে পারে না। সরকারের ভুলভ্রান্তি দেখিয়ে দেয়া, গঠনমূলক সমালোচনা করা, সংসদের ভেতরে ও বাইরে দেশ ও জনগণের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রাখাÑ এসবই বিরোধী দলের দায়িত্ব। জামায়াতে ইসলামী ও তার জোট সঙ্গীদের কাছ থেকে এ রকম দায়িত্বশীল ভূমিকাই মানুষ প্রত্যাশা করে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিজ্ঞ, বিদগ্ধ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনিই বিরোধী দলের নেতা হবেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর, তিনি তা মেনে নিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ নিয়ে তার কিছু প্রশ্ন থাকলেও তা সরিয়ে রেখে তিনি সংসদে তার দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার এই দৃষ্টিভঙ্গী ও বক্তব্য প্রশংসিত হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে নির্বাচনের আগে ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, তার দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সরকারি জমি ও গাড়ি নেবেন না। জানা গেছে, এ অঙ্গীকারে জামায়াত দৃঢ় আছে। যাহোক, জামায়াতের আমিরের উদ্দীপক ও সহযোগিতামূলক মনোভাব ও বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে সৌজন্য ও সভ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, তা টক অব দি কান্ট্রি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তিনি জামায়াত আমিরের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন। আলাপে মিলিত হয়েছেন। একইভাবে তিনি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়েছেন। কথা বলেছেন। ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলাম তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। তাদের মধ্যে জরুরি কিছু আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তারেক রহমান তার সরকারকে সহযোগিতা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারাও তার আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা, সৌজন্যপূর্ণ আচরণ ও সহযোগিতা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। অবস্থা এতটাই নাজক, সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের বাসাবাড়িতে যাতায়াত ও কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। স্বৈরাচার রাজনীতিকে এতটাই নিচে নামিয়ে দিয়েছিল। জামায়াত আমির ও এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলামের বাসায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাওয়া ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফেরার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করছে পর্যবেক্ষক মহল। দেশের মানুষও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে আন্তরিক সুসম্পর্ক কামনা করে। আমরাও প্রত্যাশা করি, ইতিবাচক এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি আগামীতে আরো গভীর, আন্তরিক ও ফলপ্রসূ হবে।