dailyinqilab.com · Mar 1, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260301T184500Z
খ্রিষ্টান শক্তির প্রতিনিধি যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল ইরানের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। হামলার প্রধান টার্গেট রাজধানী তেহরান। এই সঙ্গে ইসপাহান, কোম, কারাজ ও কারমান শাহও আক্রান্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই সব শহরে ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে সামরিক-বেসামরিক বহু স্থাপনা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব বস্তুগত ক্ষতি হয়তো ইরান একদিন পূরণ করতে পারবে। কিন্তু যে ক্ষতি কখনোই পূরণ হবে না, তা হলো সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ক্ষতি। তিনি ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, শনিবার সকালের হামলায় তার অবস্থানস্থল আক্রান্ত হয় এবং সেখানেই তিনি নিহত হন। হামলায় আরো নিহত হয়েছেন আইআরজিসি কমান্ডার মেজর জেনারেল পাকপুর, অ্যাডমিরাল আলী শামখানি, সরকারের জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা, জ্যৈষ্ঠ পারমাণবিক কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন পদাধিকারী। খামেনির মৃত্যুতে ইরান ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানে হামলার একটা বড় লক্ষ্য ছিল খামেনিকে হত্যা করা। আখেরে সেটা পূরণ হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার সম্মান ও মর্যাদা কতটা, তা পরিমাপযোগ্য নয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে দিক নির্দেশনা পাওয়ার জন্য ইরানী জনগণ তার ওপর ভরসা করতো, নির্ভর করতো। তিনি দীর্ঘদিন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন ইরানী জনগণের শেষ ঠিকানা। তাদের সেই ঠিকানা এখন শূন্য হয়ে গেছে। তার স্থলাভিষিক্ত কে হবেন এখনো তা ঠিক হয়নি। ইরানের সংবিধানে এর প্রক্রিয়া লিপিবদ্ধ আছে। আশা করা যায়, উপযুক্ত সময়ে নতুন নেতা নির্বাচিত হবেন। আরো একট পরিতাপের বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই পরিকল্পিত হামলায় একটি মেয়েদের স্কুলে আঘাত হানায় ১৪৮ জন নিহত হয়েছে। এর আগে গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়েছিল। তখন ইরানে প্রাণহানিসহ সামরিক-বেসামরিক অনেক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছিল। এরকম যৌথ হামলা যে আরো হতে পারে, তার আশংকা ছিলই। জানা গেছে, চলমান হামলা চালানোর প্রস্তুতি চলছে কয়েক মাস ধরে। গোয়েন্দাতথ্য চালাচালি, হামলার নীলনকশা প্রণয়ন ইত্যাদি করে একদিনে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা শুরু করেছে। হামলার অজুহাত হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনায় অচলাবস্থা নেমে আসাকে। পরবর্তী আলোচনা হওয়ার কথা ছিল ভিয়েনায়। তার আগেই তারা হামলা চালিয়ে ওই আলোচনা অনিশ্চিত করে দিয়েছে। আসলে হামলার ওসিলা তৈরিই লক্ষ্য, আলোচনা মুখ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান পূর্বাপর এ দাবি অস্বীকার করে আসছে। ইরানের কথা, তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দ্যেশ্যে পরিচালিত। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল তা মানতে নারাজ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে এমন একটা চুক্তি করতে চাইছে, যাতে ইরান কোনো উদ্দেশ্যেই পরমাণু কর্মসূচি চালাতে না পারে। তথাকথিত পরমাণু চুক্তি-আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক শর্ত দিয়েছে। সর্বশেষ তার তিনটি শর্তের একটি হলো, ইরানের হাতে থাকা সমৃদ্ধকরণকৃত সব ইউরেনিয়ম যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে হবে। ইরান সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে রাজি হলেও যুক্তরাষ্ট্র তার দাবিতে অটল থাকে। দ্বিতীয় শর্ত হলো, ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে হবে; এতটাই সীমিত করতে হবে, যাতে তার কোনো কার্যকারিতা না থাকে। তৃতীয় শর্ত হলো, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের পক্ষে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলো ভেঙ্গে দিতে হবে। বলা বাহুল্য, এসব শর্ত কার্যত ইরানের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় ইচ্ছা, বন্ধু নির্বাচন করার অধিকারকে অস্বীকার করার নামান্তর। ওই সব শর্ত মানার অর্থÑ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে নতজানু হওয়া, আত্মসমর্পণ করা। ইরানী জাতির মতো ঐতিহ্যবাহী কোনো জাতি এধরনের অবমাননাকর শর্তে চুক্তি বা সমঝোতা করতে পারে না। ইরান বিলক্ষণ জানে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি একসঙ্গে হামলা চালায় তবে ক্ষতির মাত্রা তারই বেশি হতে পারে। এটা জানা সত্ত্বেও সে তাদের এতটুকু কেয়ার করেনি। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা যথাসাধ্য প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। পাল্টা আক্রমণ করতেও পিছপা হচ্ছে না। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায়। একই সঙ্গে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সাউদী আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। সন্দেহ নেই, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই দফায় ইরানের ওপর হামলা ও আগ্রাসন চালিয়ে বড় রকমের ঝুঁকি নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পরদেশে আগ্রাসন, হামলা বা যুদ্ধের রেকর্ড মোটেই অনুকূল নয়, বরং হতাশাজনক। সব জায়গায় তার পরাজয়ের নজির সৃষ্টি হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা আফগান যুদ্ধের কথা। উভয় যুদ্ধে অপমানজনকভাবে পরাজিত হয়ে দেশে ফিরে যেতে হয়েছে নাক উঁচু করা মার্কিন সেনাদের। তারপরও বিশ্বে দাদাগিরি ফলাতে, শক্তির ঔদ্ধত্য দেখাতে, হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে, লুণ্ঠনেচ্ছা বাস্তবায়ন করতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন ও হামলার ধারা অব্যাহত রেখেছে। ইরাককে অন্যায় যুদ্ধে ধ্বংস করে দিয়েছে। সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করেছে। লিবিয়াকে ধ্বংস করেছে, গাদ্দাফীকে হত্যা করেছে। সিরিয়ার অবস্থাও একই রকম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরাকে, লিবিয়ায়, সিরিয়ায় নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা তার হাতে থাকেনি। ইরানের ক্ষেত্রে পরিণতি একই রকম হবে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের ওপর আগ্রাসন ও হামলা বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হচ্ছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সাধারণ এ অন্যায় হামলায় প্রতিবাদ জানাচ্ছে। অন্যান্য দেশেও প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। বিভিন্ন দেশের তরফে উভয় পক্ষের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা নিরবতা দেখিয়ে তার অপ্রয়োজনীয়তা ও অকার্যকারিতার প্রমাণ দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ, আমিরসহ অন্যান্য এলাকার মুসলিম প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীদের স্মরণ রাখা দরকার, তাদের ক্ষেত্রেও সাদ্দাম, গাদ্দাফী বা খামেনির মতো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ খ্রিষ্টান বিশ্ব, ইসরাইল এবং ভারতকে বরাবরই মুসলিম দেশ ও জনগণের প্রতিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কেন এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, তা মুসিলম বিশ্বের বিদগ্ধজনদের অজানা নেই। অথচ, এর পরও মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ ও সংহত হতে পারছে না। এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে না। মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ যদি এখনো সতর্ক, সাবধান ও সক্রিয় না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের আরও দুর্ভোগ, বিপর্যয় ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের শান্তি-স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তীব্র আকার নিতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সংকট-সমস্যা গুরুতর রূপ নিতে পারে। এমতাবস্থায়, জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উচিত অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেয়া। এ ব্যাপারে তাদের সাফল্যের ওপর ভবিষ্যতে অনেক কিছুই নির্ভর করছে।