sachalayatan.com · Feb 22, 2026 · Collected from GDELT
Published: 20260222T074500Z
সাহিত্য লিখতে মঞ্চায়। সচল হইতে মঞ্চায়। কিন্তু ক্যাম্নে কি? একছুডো ভাইরে (বেয়াদ্দব কিন্তু আমার অতিপ্রিয়, লেখালেখির গুনবিশিষ্ট) প্রশ্ন করলাম-বলত কিভাবে লেখা শুরু করা যায়? ছোকরা কয় লিখুন, লিখে ফেলুন, যা মনে আসে লিখে ফেলুন। আমি প্রশ্ন করলাম তা কি নিয়ে লেখা যায় বলতো? ছোকরা হেসে বলে-লিটারেচার রিভিউ করেন, লিটারেচার রিভিউ। তারপর থেকে পড়া যে শুরু করলাম, পড়তেই আছি, পড়তেই আছি। পড়ি আর ভাবি, এত ভালো লেখা কি ভাবে সম্ভব? পড়তে পড়তে কত লেখকের লেখনীর সাথে পরিচয় হল তার ইয়ত্তা নেই, নতুন কতকিছু জানলাম তার হি্সাব নেই। কিন্তু যতই পড়ি, ততই ভিতরে ভিতরে কুকড়ে যাই, লেখার আগ্রহও হারিয়ে ফেলি। সাহস করে লেখা শুরু করলাম। গবেষণা আমার কম্ম নহে, ঐটা আপাতত আমার পেশা। আমার বাবা আমাকে ছোট বেলায় বলতেন ওরে দিয়ে চাষবাস ও হবে না, পানিতে গেলে ঠাণ্ডা লাগে। আবার আমার বাংলার জ্ঞান দেখে বলতেন ওর পেটে বোমা মারলেও একটা সাহিত্য বের হবে না। কাজেই মোমিন সাবধান! গত পর্বে ডাঃ অনিল পট্টিকে নিয়ে লিখেছিলাম। আজকের গল্প জার্মান পদার্থবিদ “জ্যান হ্যান্ড্রিক শুন” (Jan Hendrik Schön) কে নিয়ে। ইনি একজন সত্যিকারের ডঃ, পিএইচডি ওয়ালা । জার্মান ভাষায় “শুন” অর্থ সুন্দর হলেও শুন যে কাজ করেছিলো তা মোটেই সুন্দর ছিল না। শুন ১৯৯৭ সনে জার্মানীর ইউনিভার্সিটি অফ কন্সট্যাঞ্জ (University of Konstanz) থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। শুনের গবেষণার বিষয় ছিল অর্ধপরিবাহী বস্তু (Semiconductor material) নিয়ে। সুপরিবাহী (কন্ডাক্টিভ) আর কুপরিবাহী (ইন্সুলেটর) বস্তু নিয়ে সবার হয়ত সম্যক ধারনা আছে। সুপরিবাহীর প্রতিরোধক্ষমতা (রেজিষ্টান্স) কম থাকার কারণে ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়, কুপরিবাহী এর বিপরীত। মনে আছে তো ওহমের সুত্র? অর্ধপরিবাহীর অবস্থান এদের মাঝামাঝি। অর্ধপরিবাহীর সবচেয়ে বড় সুবিধা এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তা কিভাবে বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়? যেমন ধরুন, সিলিকন একটি অজৈব (ইনঅরগ্যানিক) কুপরিবাহী পদার্থ, এর স্ফটিকের (ক্রিস্টাল) মধ্যে অন্য কোন পদার্থ পরিমানমত জোরপূর্বক ঢুকিয়ে (একে ডোপিং বলে) সিলিকনকে চাহিদামাফিক পরিবাহী পদার্থে রূপ দেওয়া যায়, প্রয়োজনমত নিয়ন্ত্রণও করা যায়। আধুনিক ইলেকট্রনিক্স জগতের ভিত্তিই হল এই অর্ধপরিবাহীগুলো। কম্পিউটারের মাদারবোর্ড খুললে যে হাজার হাজার চিপ (আইসি, ট্রান্সিস্টর, ডায়োড, এলইডি, ক্যাপাসিটর) দেখা যায় এর সবই এই সেমিকন্ডাক্টর। সিলিকন হল সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত অর্ধপরিবাহী পদার্থ। সিলিকনের বহুল ব্যবহার থেকেই আমেরিকার “সিলিকন ভ্যালী”র এরকম নামকরণ, আমরা চিপ বানানোর কারিগর। আজ যেমন দুনিয়াতে সবাই জৈব জৈব (অরগ্যানিক অরগ্যানিক) করে চিৎকার করে, পদার্থবিদ/প্রকৌশলীরাও চাইল জৈব পদার্থ (অরগ্যানিক অর কার্বোনেসিয়াস) দিয়ে চিপ তৈরী করতে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, বানিয়েও ফেলল। জৈব পদার্থ দিয়ে তৈরী চিপ খুব হালকা, সস্তা, নমনীয় এবং পরিবেশবান্ধব হল। কিন্তু সমস্যা একটা রয়েই গেল। চিপগুলোর প্রতিরোধক্ষমতা (রেজিষ্টান্স) কমানো সম্ভব হল না, ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহও কমই রয়ে গেল। এই প্রযুক্তি সফল হলে চিপের আকার এবং তৈরীর খরচ এতটাই কমানো সম্ভব হতো যা চিন্তারও বাইরে। হতে হতেও হইল না। একটা কারিগরি বাধা রয়েই গেল জৈব পদার্থ দিয়ে চিপ তৈরীর ক্ষেত্রে। হ্যান্ড্রিক শুনের কথা বলছিলাম। শুন পিএইচডি শেষ করার আগে সামার ইন্টার্ন হিসাবে বেল ল্যাবে (Bell Lab) কিছুদিন কাজ করেছিলেন, পরবর্তীতে পোষ্টডক (postdoc) হয়ে আবার ফিরে আসেন। আমাদের জাফর ইকবাল স্যার এই বেল ল্যাবের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেল কোরে (Bell Core) ছিলেন [বর্তমানে টেলিকোর্ডিয়া (Telecordia) নামে পরিচিত]। তো শুনের পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল জৈব পদার্থ দিয়ে চিপ তৈরীর এবং তার বানিজ্জিকীকরনের কারিগরি বাধা দূর করার। শুনের গবেষণালদ্ধ ফলাফলও ছিল আশ্চর্য রকমের ভালো। মাত্র ২৭ বছর বয়সে শুন নিজেকে একজন প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাবহারিক পদার্থবিদ (Experimental Physicist) হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, অনেকের কাছে মনে হয়েছিল শুন ভবিষ্যতে বড় কিছু অর্জন করবেন, হয়ত বা নোবেল পুরস্কার। শুনের দাবী ইউনিভার্সিটি অফ কন্সট্যাঞ্জে প্রথম তিনি জৈব পদার্থ দিয়ে তৈরী অর্ধপরিবাহী বস্তুর উচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা (রেজিষ্টান্স) কমাতে সক্ষম হন, বেল ল্যাবেও তিনি একই ফলাফল প্রত্যক্ষ করেন। শুধু তাই নয়, তার গবেষণালদ্ধ ফলাফল থেকে মনে হয় জৈব পদার্থ দিয়ে উচ্চ মাত্রার সুপরিবাহী ( সুপার কন্ডাক্টিভ) তৈরীও খুব বেশী দূরে নয়। তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। শুনের গবেষণালদ্ধ ফলাফল সায়েন্স, নেচার, ফিজিক্যাল রিভিউ, আডভাঞ্চড ম্যাটেরিয়াল প্রভৃতি নামকরা সাময়িকীতে প্রকাশ পায়। দেখা গেছে ২০০১ সনের প্রতি আট দিনে তার একটি করে আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। পুরস্কারসরূপ বেল ল্যাবে তার চাকরী পাকা হল। জার্মানীর বিখ্যাত মাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সিটিউটে পরিচালক হওয়ার একটা লোভনীয় প্রস্তাবও তিনি ঐ সময়ে পেয়েছিলেন, শুন প্রস্তাবটি গ্রহন করবেন ভাবছিলেন। আগেই বলেছি সায়েন্টিফিক কম্মুনিটি হল বিশ্বনিন্দুক। অনেকের নাকি প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিলো কোথাও একটা কিন্তু আছে, কেউ আগায় এসে প্রশ্ন তুলে নাই। এরপর কর্নেল ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপক আগায় এসে প্রশ্ন তুলেন, বলেন তোমার ফলাফল টু গুড, ক্যাম্নে কি? আমি বুইড়া মানুষ এতদিনেও কিছু পাইলাম না, তোমারটা মানি না। তিনি তার স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এরপর আর অনেকে আগায় এসে প্রশ্ন তুলেন আরও অনেক অসংগতি নিয়ে। ২০০২ সনে বেল ল্যাব তদন্ত শুরু করে ঘটনার আড়ালের ঘটনা জানতে। তার বিরুদ্ধে ২৪ টি অভিযোগ আনা হয়, প্রমানিত হয় ১৬ টি। শুধু তাই নয়, দেখা যায় শুন কোন ল্যাব বুকে তার এক্সপেরিমেন্টাল রেকর্ড তো রাখেইনি, তার কম্পিউটারের সব এক্সপেরিমেন্টাল ডাটা ইচ্ছাকৃত ভাবে নষ্ট করে ফেলেছে, সাথে সাথে তার অরিজিনাল স্যাম্পলগুলোও নষ্ট করে ফেলেছে। বেল ল্যাব শুনকে চাকরীচ্যুত করে। শুনের আর্টিকেল গুলো রিট্রাকটেড করা হয়, তাদের মধ্যে সায়েন্স করে ৯ টি, নেচার ৭ টি, আডভাঞ্চড ম্যাটেরিয়াল ২ টি, আরও অনেক আর্টিকেল রিট্রাকটেড করা হয়। ইউনিভার্সিটি অফ কন্সট্যাঞ্জও শুনের কাজ নিয়ে তদন্ত শুরু করে এবং শুভঙ্করের ফাঁকি দেখতে পায়। ২০০৪ সনে ইউনিভার্সিটি অফ কন্সট্যাঞ্জ শুনকে প্রদত্ত ডক্টরেট ডিগ্রি প্রত্যাহার করে নেয়। শুন উল্টা ইউনিভার্সিটির নামে মামলা ঠুকে দেয়, কিন্তু লাভ হয় না। তার ডক্টরেট ডিগ্রি অফিসিয়ালী বাতিল করা হয়। বেল ল্যাবে শুনের ২০ জন গবেষণা সহযোগী (Collaborator) ছিলেন, তাদের গায়ে মশার কামড়ও পড়েনি। তাদের দাবী শুন নিজেই সব করতেন। দস্যু রত্নাকরের (পরে বাল্মীকি) কথা মনে আছে তো, পাপের ভাগ কেউ নেয় না। এরপর থেকে খোজ দ্যা সার্চ দিয়েও শুনের কোন খোজ পাওয়া যায়নি। শুন নিজে স্বীকার করেছিলেন যে তার হয়ত কোথাও কোন ভুল হয়েছে। তার ভাষায় এক্সপেরিমেন্টালী এই ফলাফল পেলে আমার করার কি আছে? হয়ত কেউ কোন দিন/কোন কালে আমার ফলাফল পুনরুৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত অজস্রবার চেষ্টার পরেও কেউ শুনের ফলাফলের ধারে কাছেও পৌছাতে পারেনি। আগের পর্ব: এ্যাকাডেমিক পাবলিশিং-১ (চলবে) কুমার